পায়ুপথের সাধারণ সমস্যা: রোগীর জন্য নির্দেশিকা
ডা. তামের রুশদি আলআলফি, কনসালট্যান্ট জেনারেল ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন, আল খোবার, সৌদি আরব
পায়ুপথের আশপাশের সমস্যা খুবই সাধারণ এবং বেশিরভাগই বিপজ্জনক নয়। লজ্জার কারণে অনেকে মাসের পর মাস ডাক্তারের কাছে যান না। এই নির্দেশিকায় সবচেয়ে সাধারণ অবস্থা, তাদের লক্ষণ ও চিকিৎসা ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যাতে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় আপনি আত্মবিশ্বাসী থাকতে পারেন।
দ্রুত নির্দেশিকা: আমার কী হতে পারে?
- টিস্যু বা টয়লেটে উজ্জ্বল লাল রক্ত, ব্যথা কম বা নেই: প্রায়ই অর্শ।
- মলত্যাগের সময় ও পরে তীব্র বা জ্বালাপোড়া ব্যথা: প্রায়ই পায়ুর ফাটল (অ্যানাল ফিসার)।
- দপদপে ব্যথা, গরম ফোলা পিণ্ড, জ্বর: সম্ভবত ফোড়া। একই দিনে ডাক্তার দেখান।
- বারবার স্রাব বা পায়ুর কাছে ছোট ছিদ্র: সম্ভবত ভগন্দর (ফিস্টুলা)।
- একটানা চুলকানি বা জ্বালা: প্রায়ই পায়ুর চুলকানি।
কারণ নিশ্চিত করা যায় কেবল পরীক্ষার মাধ্যমে, তাই শুধু এই তালিকার ওপর নির্ভর করবেন না।
অর্শ (পাইলস)
অর্শ হলো পায়ুনালির ভেতরের রক্তনালির নরম গদি। এগুলো ফুলে গেলে সমস্যা হয়।
সাধারণ লক্ষণ: ব্যথাহীন উজ্জ্বল লাল রক্ত, মলত্যাগের সময় বেরিয়ে আসা পিণ্ড, চুলকানি, পেট পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি।
কী সাহায্য করে:
- বেশি আঁশযুক্ত খাবার (সবজি, ফল, গোটা শস্য) ও প্রচুর পানি।
- জোরে চাপ দেবেন না এবং টয়লেটে বেশিক্ষণ বসবেন না (মোবাইল ফোন এড়ান)।
- ১০ থেকে ১৫ মিনিট কুসুম গরম পানিতে বসা (সিটজ বাথ)।
- উপসর্গ কমাতে ডাক্তারের পরামর্শে ক্রিম বা সাপোজিটরি।
- স্থায়ী উপসর্গে চেম্বারে রাবার ব্যান্ড লাইগেশনের মতো পদ্ধতি।
- বড় বা জটিল অর্শ, যা অন্য চিকিৎসায় সারে না, তার জন্য অস্ত্রোপচার।
পায়ুর ফাটল (অ্যানাল ফিসার)
ফিসার হলো পায়ুর ভেতরের আস্তরণে ছোট ছেঁড়া, যা সাধারণত শক্ত মল বের হওয়ার কারণে হয়।
সাধারণ লক্ষণ: মলত্যাগের সময় তীব্র ব্যথা যা পরে কয়েক ঘণ্টা জ্বালার মতো থাকতে পারে, সামান্য উজ্জ্বল লাল রক্ত, এবং টয়লেটে যেতে ভয়।
কী সাহায্য করে:
- আঁশ, পানি এবং ডাক্তার দিলে মল নরম করার ওষুধ।
- মলত্যাগের পর কুসুম গরম পানিতে বসা।
- প্রেসক্রিপশনের মলম, যা পায়ুর পেশি শিথিল করে ও ক্ষত সারাতে সাহায্য করে।
- ফাটল প্রায় ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের বেশি থাকলে বটুলিনাম টক্সিন ইনজেকশন বা ছোট অপারেশন বিকল্প। আপনার সার্জন বিকল্পগুলো বুঝিয়ে দেবেন।
পায়ুর পাশে ফোড়া
ফোড়া হলো পায়ুর কাছে পুঁজের জমা, যা একটি ছোট গ্রন্থির সংক্রমণ থেকে হয়।
সাধারণ লক্ষণ: বাড়তে থাকা দপদপে ব্যথা, লাল, গরম ও ছুঁলে ব্যথা করা ফোলা, জ্বর, বসতে কষ্ট।
চিকিৎসা: ফোড়া সাধারণত সার্জনকে দিয়ে কেটে পুঁজ বের করতে হয়। শুধু অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণত যথেষ্ট নয়। দেরি করবেন না, কারণ দেরিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পায়ুর ভগন্দর (ফিস্টুলা)
ভগন্দর হলো একটি ছোট সুড়ঙ্গ, যা পায়ুর ভেতরকে পাশের ত্বকের সঙ্গে যুক্ত করে। এটি প্রায়ই ফোড়ার পর হয়।
সাধারণ লক্ষণ: ত্বকে ছোট ছিদ্র, বারবার স্রাব বা পুঁজ, বারবার ফোড়া, ত্বকে জ্বালা।
চিকিৎসা: ভগন্দর নিজে থেকে খুব কমই সারে। সাধারণত অস্ত্রোপচার লাগে, যার ধরন নির্ভর করে সুড়ঙ্গটি মল ধরে রাখার পেশির কতটা কাছে তার ওপর। সার্জন এমনভাবে অপারেশনের পরিকল্পনা করবেন যাতে ভগন্দর সারে এবং এই পেশিগুলো সুরক্ষিত থাকে।
পায়ুর চারপাশে চুলকানি
এটি একটানা চুলকানি, যা প্রায়ই রাতে বাড়ে। এর অনেক কারণ আছে: আর্দ্রতা, অতিরিক্ত পরিষ্কার করা, ত্বকের রোগ, অর্শ বা মল চুঁইয়ে পড়া।
কী সাহায্য করে:
- পানি দিয়ে আলতো করে পরিষ্কার করুন এবং চেপে চেপে শুকান। ঘষবেন না।
- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া সুগন্ধি সাবান, ওয়াইপস ও ক্রিম এড়ান।
- ঢিলেঢালা সুতির অন্তর্বাস পরুন।
- চুলকাবেন না। দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে ডাক্তার দেখান।
প্রতিরোধ: যেসব অভ্যাস আপনাকে রক্ষা করে
- আঁশযুক্ত খাবার খান এবং প্রতিদিন যথেষ্ট পানি পান করুন।
- মলত্যাগের বেগ এলে সঙ্গে সঙ্গে যান এবং জোরে চাপ দেবেন না।
- সক্রিয় থাকুন ও ওজন সুস্থ রাখুন।
- কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ার চিকিৎসা তাড়াতাড়ি করুন।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
দ্রুত ডাক্তার দেখান যদি:
- রক্তপাত বারবার হয়, বেশি হয়, বা প্রায় দুই সপ্তাহে না থামে।
- মলত্যাগের অভ্যাসে কয়েক সপ্তাহের বেশি পরিবর্তন থাকে।
- অকারণে ওজন কমে, ক্লান্তি থাকে বা কালো মল হয়।
- নতুন পিণ্ড, স্রাব বা ব্যথা হয় যা ভালো হচ্ছে না।
জরুরি বিভাগে যান যদি:
- প্রচুর রক্তপাত, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়া হয়।
- জ্বরসহ তীব্র ব্যথা বা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া লাল ফোলা হয়।
- প্রস্রাব বা মলত্যাগ করতে না পারেন।
সঠিক পরীক্ষা ছাড়া মলদ্বার থেকে রক্তপাতকে "শুধু অর্শ" ধরে নেবেন না, বিশেষ করে যদি আপনার বয়স ৪৫-এর বেশি হয় বা পরিবারে অন্ত্রের ক্যানসারের ইতিহাস থাকে।
এই তথ্য আপনার চিকিৎসক দলের পরামর্শের বিকল্প নয়।